রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও বাংলামোটরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত পান্থকুঞ্জ পার্ক। সাধারণ মানুষের একটু সবুজের ছোঁয়া আর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কথা থাকলেও, পার্কটি এখন পরিণত হয়েছে মাদকসেবী ও অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে। দিন-রাতের কোনো পার্থক্য নেই; পার্কের ভেতরে-বাইরে এখন ২৪ ঘণ্টাই চলছে প্রকাশ্য মাদক সেবন ও কেনাবেচা। আর এই পুরো অপরাধ সাম্রাজ্যকে ঢাল হিসেবে রক্ষা করছে একদল কথিত ‘মিডিয়া কর্মী’ ও ‘সাংবাদিক’।
ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অস্ত্র ‘সাংবাদিক পরিচয়’: অনুসন্ধানে জানা যায়, এই মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতারা গলায় নামসর্বস্ব, অখ্যাত বা ভুঁইফোড় অনলাইন পোর্টাল ও পত্রিকার আইডি কার্ড ঝুলিয়ে প্রকাশ্য ঘুরে বেড়ায়। মাদক সেবন বা বিক্রির সময় কোনো সাধারণ মানুষ বা পার্কের নিরাপত্তাকর্মী বাধা দিতে গেলে, মুহূর্তেই তারা রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। ক্যামেরা ও পরিচয়পত্র উঁচিয়ে ‘সাংবাদিকতার’ দাপট দেখানো হয়। উল্টো সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, চরিত্রহনন বা চুরির অপবাদ দেওয়ার ভয়ভীতি দেখানো হয়। এই ব্ল্যাকমেইলের আতঙ্কে স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং পথচারীরা মুখ খুলতে সাহস পান না।
অভিযোগের তীর বেসরকারি টেলিভিশন ‘বাংলাভিশন’-এর কর্মীরা: অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই মাদক সিন্ডিকেটের পেছনে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘বাংলাভিশন’-এর কয়েকজন কর্মীর সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। স্থানীয়দের দাবি—চ্যানেলটির ২ জন প্রডিউসার, ভিডিও এডিটর, মার্কেটিং এবং গ্রাফিক্স বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রতিদিনই সকাল, সন্ধ্যা ও রাতে এখানে এসে মাদক সেবন করেন। মূলধারার একটি টেলিভিশনের লোগো ও পরিচয় ব্যবহার করায় তাদের ভয়ে সাধারণ মানুষ, ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পথচারীরা মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিদিনই পান্থকুঞ্জ পার্কের ভেতরে ও বাইরে প্রকাশ্য মাদকসেবন চলছে। কারা মাদক বিক্রি করছে আর কারা সেবন করছে, এলাকার সবাই তাদের খুব ভালো করেই চেনে। কিন্তু নিজেদের নিরাপত্তার ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। প্রতিদিনই চোখের সামনে এসব অপরাধের মহোৎসব দেখছি, অথচ অসহায় হয়ে চুপ করে থাকতে হচ্ছে।”
মাদক পরিবহনে নতুন কৌশল: পিকআপভ্যান ও রিকশা সিন্ডিকেট:আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এই চক্রটি অত্যন্ত চতুর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। মাদকের বড় বড় চালান রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিয়ে আসার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে মালবাহী পিকআপ ভ্যান। কাঁচামাল বা অন্য মালামাল পরিবহনের আড়ালে এই পিকআপগুলো পান্থকুঞ্জের স্পটে মাদক পৌঁছে দেয়। এরপর পার্কের আশেপাশের এলাকায় খুচরা ক্রেতাদের কাছে মাদক সরবরাহ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে একশ্রেণীর রিকশাচালকদের। সাধারণ রিকশাযাত্রী বা চালক মনে করে পুলিশ সাধারণত এদের তল্লাশি করে না, আর এই সুযোগটিই পুরোদমে কাজে লাগাচ্ছে মাদক চক্র।
বিপন্ন পরিবেশ, অসহায় মানুষ: দৃষ্টিনন্দন এই পার্কটির ভেতর এখন মাদকসেবীদের আস্তানায় দিন- রাতে চলছে মাদক কেনাবেচা। কথিত সাংবাদিকদের ক্ষমতার দাপট আর রিকশা- পিকআপভ্যান নেটওয়ার্কের কারণে পার্কটি এখন সাধারণ পরিবার, নারী ও শিশুদের জন্য পুরোপুরি একটি নিষিদ্ধ এবং আতঙ্কের এলাকা হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, অতি দ্রুত তথাকথিত সাংবাদিকদের মুখোশ উন্মোচন করে সাধারণ মানুষের জন্য পার্কটি নিরাপদ করে তোলা। পুলিশ আন্তরিক হলেই সম্ভব মাদকমুক্ত পান্থকুঞ্জ পার্ক।
