People Voice
লিড নিউজ

বাংলাদেশের কোন কোন রাষ্ট্রপতি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি?

শুক্রবার (২৪ জুলাই) মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে মেয়াদ পূর্তির আগে দায়িত্ব ছাড়া অষ্টম রাষ্ট্রপতি হলেন তিনি।

স্বাধীনতার পর থেকে হত্যা, সামরিক অভ্যুত্থান, সংবিধান সংশোধন, গণ-অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক সংকটের মতো নানা ঘটনায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ বারবার পরিবর্তনের মুখে পড়েছে।

এ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ, ভারপ্রাপ্ত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে আসীন হওয়া ১৮ জন ব্যক্তির মধ্যে ১০ জনই নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছেড়েছেন।

এর মধ্যে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় দুজন রাষ্ট্রপতি নিহত হন। আর আটজন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে পদত্যাগ করেন বা অপসারিত হন। অর্থাৎ, স্বাধীন বাংলাদেশে মাত্র আটজন রাষ্ট্রপতি তাদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করেছেন।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে মেয়াদ পূর্তির আগে দায়িত্ব ছাড়া অষ্টম রাষ্ট্রপতি হলেন তিনি।

শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান—দুজনই রাষ্ট্রপতি থাকাকালে নিহত হন। উভয় ক্ষেত্রেই তাদের হত্যার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশ দায়ী ছিল।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে মুজিবনগর সরকার শপথ নেয়। তবে তিনি সেসময় পাকিস্তানে কারাবন্দি থাকায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৭৩ সালের ১০ এপ্রিল তিনি পুনর্নির্বাচিত হন। ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে তিনি মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব নিতে পদত্যাগ করেন।

তার পদত্যাগের পর ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর স্পিকার মোহাম্মদউল্লাহ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি তিনি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বাকশাল গঠনের পর শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংসদীয় শাসনব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। এরপর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হন। একই বছরের নভেম্বরে তাকে অপসারণ করা হলে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান।

আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

জিয়াউর রহমান দুই দফায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দেশের প্রথম সরাসরি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে তিনি নিহত হন।

তার মৃত্যুর পর আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং পরে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে তার মেয়াদের অবসান ঘটে।

এরশাদ নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) ঘোষণা করেন এবং বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন। তিনি ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ থেকে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর এরশাদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই বছর প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে তিনি ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিনের সম্মিলিত বিরোধী আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এরশাদের পদত্যাগ নিশ্চিত করতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদকে উপ-রাষ্ট্রপতি করা হয়। পরে তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনা করেন।

১৯৯১ সালের আগস্টে বাংলাদেশ আবার সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে যায়।

এরপর বিএনপির মন্ত্রিসভার তৎকালীন সদস্য আবদুর রহমান বিশ্বাস পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থনে সাহাবুদ্দীন আহমেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর শপথ নেন এবং ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর দায়িত্ব থেকে অবসর নেন।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ২০০২ সালের ২১ জুন ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্যদের আস্থা হারানোর পর, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের অনুরোধে তিনি পদত্যাগ করেন।

এ ছাড়া, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার কবরে শ্রদ্ধা না জানানো নিয়েও দলটি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সমালোচনা করে।

তার পদত্যাগের পর ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্পিকার ব্যারিস্টার মোহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির সমর্থনে অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।

২০০৬ সালের শেষ দিকে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও গ্রহণ করেন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি করে ২২ জানুয়ারি নির্ধারিত সংসদ নির্বাচন স্থগিত করার পর তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান। পরদিন তিনি ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন। ২০০৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হলেও, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে বহাল ছিলেন।

২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৩ সালের ২০ মার্চ তিনি মারা যান। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় স্বাভাবিক কারণে মারা যাওয়া দেশের একমাত্র রাষ্ট্রপতি তিনি।

তার মৃত্যুর পর তৎকালীন স্পিকার ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ২০১৩ সালের ২০ মার্চ তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরে আওয়ামী লীগের সমর্থনে টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আওয়ামী লীগের সমর্থনে ১৯৭৫ সালে পাবনা জেলা বাকশালের যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই তার অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এরপর থেকে তার পদত্যাগ বা অপসারণ নিয়ে জল্পনা চলছিল। অবশেষে সেই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আজ তিনি পদত্যাগ করেন।

২০২৪-সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগের সময় থেকে শীর্ষ সাংবিধানিক পদে বহাল থাকা একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন তিনি।

Related posts

সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অটোনমিক নিউরোপ্যাথি রোগটি কী, চিকিৎসা আছে?

News Desk

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগ,দুদকের অনুসন্ধান চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

News Desk

ঢাকা-চট্টগ্রামসহ ১৩ জেলায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

News Desk