পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বিদেশে পলাতক প্রভাবশালী আসামিদের ফেরানোর প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে।
দুর্নীতির মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে বেনজীর আহমেদকে ১২ জুন গ্রেপ্তার করে দুবাইয়ের পুলিশ। এ কথা সরকার জানিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, তাঁকে কত দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা যাবে?
ইন্টারপোলের সঙ্গে প্রতিটি সদস্যদেশের কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ও সমন্বয়কারী সংস্থা হলো ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। বাংলাদেশে এটি পুলিশ সদর দপ্তরে অবস্থিত এবং তা আন্তর্জাতিক অপরাধী ও পলাতক ব্যক্তিদের তথ্য আদান-প্রদান ও গ্রেপ্তারে কাজ করে।
বেনজীর আহমেদকে ফেরানোর বিষয়টি নিয়ে এনসিবিতে অতীতে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে কাজ করছেন, এমন পাঁচ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁরা পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়েছেন।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বেনজীরের গ্রেপ্তার অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য বড় অগ্রগতি। তবে এটি শেষ ধাপ নয়, পুলিশের রেড নোটিশে কোনো ব্যক্তি শনাক্ত বা গ্রেপ্তার হতে পারেন; কিন্তু তাঁকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো নির্ভর করে যে দেশে তিনি আটক হয়েছেন, সেই দেশের আইন, আদালত, প্রত্যর্পণ–সংক্রান্ত চুক্তি, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং মামলার নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতার ওপর।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার সংসদে জানিয়েছেন, বেনজীর আহমেদকে ফেরাতে গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাবে।
এনসিবি আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আশাবাদী, অতি দ্রুতই বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরয়ে আনা যাবে।
রেড নোটিশ থাকলে কী হয়
অনেকের মধ্যে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ নিয়ে সাধারণভাবে একটি ভুল ধারণা আছে—এটি যেন আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। বাস্তবে তা নয়।
রেড নোটিশ হলো ইন্টারপোলের সদস্যদেশগুলোর কাছে একটি অনুরোধ, যাতে কোনো পলাতক ব্যক্তিকে শনাক্ত, অবস্থান নির্ধারণ এবং প্রয়োজনে সাময়িকভাবে আটক করা যায়। এর ভিত্তি হতে হয় সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা বিচারিক আদেশ।
অর্থাৎ বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হওয়া এবং দুবাইয়ে তাঁর গ্রেপ্তার—দুটি বড় ধাপ পার হয়েছে; কিন্তু তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেবে আমিরাতের আদালত।
বাংলাদেশকে এখন প্রমাণ করতে হবে, বেনজীরের বিরুদ্ধে মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নয়; এটি দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ, জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং বা সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে দেখাতে হবে, বাংলাদেশে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন।
ফেরানো কোন প্রক্রিয়ায়
পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেনজীরকে ফেরাতে বাংলাদেশকে সাধারণত কয়েক ধরনের নথি পাঠাতে হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র বা তদন্তসংক্রান্ত সারসংক্ষেপ, তাঁর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, অপরাধের বিবরণ, সংশ্লিষ্ট আইন ও শাস্তির বিধান, আদালতের আদেশ এবং প্রত্যর্পণের আইনি ভিত্তি। এসব নথি আমিরাত কর্তৃপক্ষের গ্রহণযোগ্য ভাষায় অনুবাদ ও প্রত্যয়ন করতে হতে পারে।
প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাওয়ার পর আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রথমে নথিপত্র যাচাই করবে। এরপর বিষয়টি আদালতের সামনে যেতে পারে। সে দেশের আদালত দেখবে, যে অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশ বেনজীর আহমেদকে ফেরত চাইছে, সেই ধরনের অপরাধ আমিরাতের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না।
একে বলা হয় ‘ডুয়াল ক্রিমিন্যালিটি’ বা উভয় দেশের আইনে অপরাধ হওয়া। দুর্নীতি, জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং বা অবৈধ সম্পদের মতো অভিযোগ সাধারণত এ পরীক্ষায় তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকে।
তবে আদালত আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করতে পারে। যেমন মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, একই ঘটনায় আগে কোথাও বিচার হয়েছে কি না, মামলা বা দণ্ড সময়সীমার কারণে অকার্যকর হয়েছে কি না, আসামির মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না, অথবা তাঁকে ফেরত পাঠালে অমানবিক আচরণ বা অন্য কোনো আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে কি না।
