ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আমদানি কার্গো ভবনের আগুন প্রায় ২৭ ঘণ্টার চেষ্টায় নিভেছে। এর আগেই ভবনে থাকা আমদানি করা সব পণ্য পুড়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে ছিল জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরির কাঁচামাল, গার্মেন্টস পণ্য, কম্পিউটার ও মোবাইলের যন্ত্রাংশ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, শিশুখাদ্য, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্য।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে কয়েক হাজার কোটি টাকা। আগুন নেভানোর পর ওই ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে ফায়ার সার্ভিস। সরকার এরই মধ্যে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সেখানে ব্যবসায়ীদের তথ্য দিতে বলা হয়েছে। এই অগ্নিকাণ্ডসহ মিরপুর ও চট্টগ্রাম ইপিজেডের আগুন নাশকতামূলক কি না, তা খতিয়ে দেখছে অন্তর্বর্তী সরকার।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আগুনে পুড়ে যাওয়া পণ্যের অর্থমূল্য এবং ওজনভিত্তিক হিসাব তৈরি করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ইনস্যুরেন্স ও সরকারি বিমা ব্যবস্থার আওতায় সহায়তা দেওয়া হবে।
- আগুন লাগার প্রায় ২৭ ঘণ্টা পর নিভেছে, ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা।
- রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জাম, ওষুধের কাঁচামালসহ সব পণ্যই পুড়ে ছাই।
- ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাবি, ক্ষতি দাঁড়াতে পারে কয়েক হাজার কোটি টাকা।
- আগুনের ঘটনাগুলো নাশকতা কি না, খতিয়ে দেখছে সরকার। কমিটি গঠন।
আমদানি কার্গো কমপ্লেকের কুরিয়ার সার্ভিস অংশ থেকে গত শনিবার বেলা সোয়া ২টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। গতকাল রোববার বিকেল ৫টার দিকে ফায়ার সার্ভিস আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ভবনটি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ। ভেতরে কিছুই অবশিষ্ট নেই।
শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় কার্গো ভিলেজ থেকে আমদানি পণ্য খালাস বন্ধ ছিল। ফলে গুদামে পণ্য মজুত ছিল বেশি। মজুত থাকা গার্মেন্টস পণ্য, ওষুধের কাঁচামাল, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার শিপমেন্ট, মোবাইল যন্ত্রাংশ, প্রসাধনী, শিশুখাদ্যসহ সব পুড়ে ছাই হয়েছে।
গতকাল দিনভর ঘটনাস্থলে ভিড় করেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা। তাঁদের একজন উত্তরার গার্মেন্টস ইনপুট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফার্স্ট অ্যান্ড সেফে’র মালিক মো. বেনজির বলেন, হংকং ও চীন থেকে রেডিমেড গার্মেন্টসের দুটি শিপমেন্ট এসেছিল। আগুনে স্যাম্পলসহ সবই পুড়ে গেছে। রোববার (গতকাল) মালামাল খালাসের কথা ছিল। তিনি ছোট ব্যবসায়ী। এটি তাঁর জন্য বিশাল ক্ষতি।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, উচ্চমূল্যের পণ্য ও জরুরি শিপমেন্ট সাধারণত আকাশপথে পাঠানো হয়। আগুনে এসব পণ্য ছাই হয়ে গেছে। এর প্রভাব শুধু বর্তমান রপ্তানিতেই নয়, ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক সুযোগেও পড়বে। তাঁর আশঙ্কা, আগুনে পোশাকশিল্পের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে। ইনামুল হক খান বলেন, বিজিএমইএ ইতিমধ্যে ক্ষতির তালিকা তৈরি শুরু করেছে। প্রতিদিন ২০০-২৫০টি কারখানার পণ্য আকাশপথে রপ্তানি হয়। ফলে ক্ষতির পরিমাণ বিপুল হতে পারে।
বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদের মতে, পুরো আমদানি সেকশন পুড়ে গেছে। ক্ষতি এক বিলিয়ন টাকার বেশি হতে পারে।
বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকেরা দাবি করছেন, ক্ষতি ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকা দাঁড়াতে পারে। বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামাল, অ্যাকসেসরিজসহ উৎপাদনসামগ্রী পুড়ে যাওয়ায় কারখানাগুলোর পণ্য তৈরি ও রপ্তানি আটকে যাবে। এতে পরোক্ষ ক্ষতি হবে অনেক।
কেপিআইভুক্ত কার্গো ভিলেজ এলাকার অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, এটি দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রগুলোর একটি। এমন জায়গায় যদি আগুনে সব পুড়ে যায়, তবে নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট। এখানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ছিল কি না, তা তদন্ত করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘বহির্বিশ্বে আমাদের যেসব ক্রেতা রয়েছেন, তাঁরাও বেশ উদ্বিগ্ন।’
