People Voice
অপরাধ

সাধারণ মানুষ কি নিরাপদ?

‘মব’ যেন নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের নানা প্রান্তে ঘটছে মব উচ্ছৃঙ্খলতা। গত এক বছরে তা উদ্বেগজনক এক সামাজিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। সরকারের তরফে কঠোর হওয়ার কথা বলা হলেও তার বাস্তবায়ন কতোদূর তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে তা ছড়িয়ে পড়ছে নানান ঘটনাতেও। তেমনি এক ঘটনা দেখা যায় বৃহস্পতিবার পল্টন মোড়ে। অভিযোগ মোবাইল চুরির। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের হাতে সোপর্দ না করে মব তৈরি করে অর্ধ উলঙ্গ করে রাস্তায় গণধোলাই দেয় একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা।

এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে একের পর এক ঘটছে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। কোনোভাবেই থামছে না মব ভায়োলেন্স (গণসহিংসতা)। সেই সঙ্গে বাড়ছে ‘নানা দাবি’ আদায়ের আন্দোলনও। পাশাপাশি খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, অপহরণ, চুরি এবং চোরাচালানসহ নানা ঘটনায় দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। সবমিলিয়ে নিরাপদ নন সাধারণ মানুষ।

মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার মুখ্য দায়িত্ব যে বাহিনীর, সেই পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। গত ১ বছর ১ মাসে ৩৩৪টি গণসহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে ২১৯টিতেই ভিকটিম হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। আর থানা আক্রমণ হয়েছে ১২টি। আসামি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে ৫৭টি ঘটনায়। এছাড়া অন্যান্য ভাবে পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে ১৫০টি। এছাড়া ছাত্র দেখলেই পুলিশের মনে এখনো ভয়ভীতি কাজ করে।

‘ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার’ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে থাকলেও পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না। এত ক্ষমতা থাকার পরও কেন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না-তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সন্ত্রাস-সহিংসতা ও অপরাধ দমনে পুলিশ কার্যত পুরোদমে কঠোর ভূমিকা পালন করতে না পারার কারণেই মূলত এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, একটি দল ক্ষমতায় আসছে-এমন হাওয়া তৈরি হওয়ায় পুলিশ তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন করতে পারছে না। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ এটি। কেননা যখন লোক দেখে রাজনৈতিক বিচার-বিবেচনায় আইন প্রয়োগ করা হবে তখন অপরাধীরা সেটা বড় সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করবে। কারও কর্মস্থল, কারও বাড়ি ভাঙচুর, দখল, চাঁদাবাজি করবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তৈরি করা সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সারা দেশে দুই হাজার ২১৬টি মামলা হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে দেশে ৪২৬টি ডাকাতি, ৬২৫টি অপহরণ, ৫৩৮৭টি চুরির ও ১০১০৯টি চোরাচালানের মামলা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থার আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ৪৯২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে ২৯টি, কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ৬১ জনের। এ সময়ে আক্রমণের শিকার হয়েছেন ১৬৫ সাংবাদিক। রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহত হয়েছেন ছয় হাজার ৩৯০ জন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৮৮ জন নারী। গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে ১০৮ জনের। যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৮ জন। এছাড়া যৌতুক ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৩৩ নারী।

পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের প্রতি মানুষের অনেক ক্ষোভ ছিল। তাই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় পুলিশ। এতে পুলিশ মানসিকভাবে ব্যাকফুটে চলে যায়। সেই সুবাধে অপরাধী ও সুযোগসন্ধানীরা তৎপর হয়ে উঠে। গত এক বছরে পরিস্থিতি অনেকটা উন্নতি হয়েছে। দ্রুতই আরও উন্নতি হবে বলে আশা করছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঘাটতি কাজে লাগিয়ে নানা ভাবে মব, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, সংঘাত-সহিংসতাসহ নানা অপরাধ ঘটানো হচ্ছে। এই জায়গাগুলোতে  সরকার চাইলে আরো কঠোর ভাবে রুখতে পারতো। কিন্ত সাধারণ মানুষ অন্তবর্তী সরকারের যা আশা করেছিল তা পূরণ হয়নি। আগামীতে এই সরকার মব বন্ধ করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

Related posts

হত্যাচেষ্টা মামলার আসামী সুবর্ণা মুস্তাফা, অপু বিশ্বাসসহ ১৭ তারকা

News Desk

সোনাইমুড়ীতে চাঁদা চেয়ে চিঠি, না পেয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তালার অভিযোগ

News Desk

টাকা লুটে সাবেক সেনা ও পুলিশ সদস্যরা জড়িত : ডিএমপি

News Desk